ঢাকা ০৪:৫৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ৪ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মাইটিভি তুমি কার?

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত: ১২:২০:১৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ জুন ২০২৫
  • / ২৭৩৬ বার পঠিত

বাংলাদেশের বেসরকারি স্যাটেলাইট টেলিভিশন খাতের একটি আলোচিত নাম ‘মাইটিভি’। তবে চ্যানেলটির পেছনে লুকানো আছে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে চলা মালিকানা বিরোধ, অবৈধ দখল, জালিয়াতি ও রাজনৈতিক প্রভাবের গল্প। সরকারি নথিপত্রে মালিক হিসেবে থাকা বিলকিস জাহানকে এ চ্যানেল থেকে সরিয়ে নাসিরুদ্দিন সাথী দীর্ঘদিন ধরে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করছেন। এই দ্বৈত মালিকানা পরিস্থিতি নিয়ে গণমাধ্যম, কর্মী ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে উদ্বেগ ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

প্রতিষ্ঠার ইতিহাস: বিলকিস জাহানের হাত ধরেই যাত্রা:
২০০৬ সালে ঢাকার মৌচাক এলাকা থেকে ‘মাইটিভি’ টেলিভিশন কার্যক্রম শুরু করেন বিলকিস জাহান। তিনি ‘ভিউ মিডিয়া’ নামের ভিডিও প্রোডাকশন প্রতিষ্ঠান চালাতেন, যার মাধ্যমে বিয়ের অনুষ্ঠানসহ বিভিন্ন ভিডিও তৈরি হতো। পরবর্তীতে ‘ভিএম ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড’ নামে একটি কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে পরিচালক হিসেবে ছিলেন বিলকিস জাহান ও তার পরিবারের সদস্যরা।

সরকারি রেকর্ডে এই প্রতিষ্ঠান মালিকানার বৈধ অধিকারভুক্ত। মাইটিভির টিন সার্টিফিকেট, কপিরাইট, ইনকর্পোরেশন সার্টিফিকেট এবং টেলিভিশনের তরঙ্গ বরাদ্দের অনুমতিসহ যাবতীয় কাগজপত্রে বিলকিস জাহানের নাম অন্তর্ভুক্ত।

মালিকানা দখলের অভিযোগ: নাসিরুদ্দিন সাথীর ভূমিকা:
তবে বাস্তবে চ্যানেলটির নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা দীর্ঘদিন ধরে করছেন নাসিরুদ্দিন সাথী। তিনি সৌদি আরবে ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে কাজ করতেন এবং দেশে ফিরে ‘ভিউ মিডিয়া’ প্রতিষ্ঠা করেন। বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গেছে, সাথী পেশিশক্তি, জালিয়াতি এবং রাজনৈতিক প্রভাবের মাধ্যমে বিলকিস জাহানের কাছ থেকে মাইটিভির কার্যক্রম জোরপূর্বক দখল করে নিয়েছেন। যদিও মালিকানা স্থানান্তর হয়নি, তবু তিনি সত্ত্বাধিকারী হিসেবে চ্যানেলের দৈনন্দিন কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছেন।

বৈধতা ও আইনি জটিলতা:
বিলকিস জাহান মালিকানা বদলের জন্য কোনও আইনি প্রক্রিয়া গ্রহণ না করায় সরকারি নথিতে তার নাম এখনও রয়েছে। ফলে মালিকানার বৈধতা নিয়ে আইনি জটিলতা তৈরি হয়েছে। তবে সরকারি নথি ও লাইসেন্সে বিলকিস জাহানের নাম থাকার পরও নাসিরুদ্দিন সাথীর দখল অবৈধ। এই অবস্থায় আইনি লড়াইও চলছে এবং আদালতে মালিকানা অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রয়াস অব্যাহত রয়েছে।

জালিয়াতি ও স্বাক্ষর কেলেঙ্কারি:
মাইটিভির আর্কাইভ হেড শেখ মুনমুন লুসি সরকারি নথিতে বিলকিস জাহানের পরিবর্তে স্বাক্ষর করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এই ভূয়া স্বাক্ষর দিয়ে সরকারি দপ্তরে কাগজপত্র পরিচালনা করা হয়, যা পরিচয় জালিয়াতি ও প্রতারণার এক বড় উদাহরণ। আইনজীবী ও মিডিয়া বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের জালিয়াতি মিডিয়ার স্বচ্ছতা ও আইন শৃঙ্খলা রক্ষায় গুরুতর হুমকি।

রাজনৈতিক প্রভাব ও লাইসেন্স প্রদান:
মাইটিভির প্রথম সম্প্রচার শুরু হয়েছিল বিএনপির শাসনামলে অনুমোদন ছাড়াই, যা পরে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বন্ধ করে দেয়। পরে আওয়ামীলীগ সরকারের আমলে সাংবাদিক নেতা আলতাফ মাহমুদ লাইসেন্স প্রাপ্তির জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে গিয়েছিলেন। তার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে রাজনৈতিক প্রভাব ও নৈতিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে।

কর্মচারীদের দুর্ভোগ: বেতন ও নিরাপত্তার অভাব:
মাইটিভির কর্মীরা অভিযোগ করেন, নিয়মিত বেতন পান না তারা। চাকরির নিরাপত্তাও নেই। দীর্ঘমেয়াদী এই আর্থিক অনিশ্চয়তা তাদের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলেছে। এ বিষয়ে চ্যানেল কর্তৃপক্ষ কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি।

সরকারি সংস্থার নিষ্ক্রিয়তা:
বিলকিস জাহান নানা দফায় সংশ্লিষ্ট দপ্তরে অভিযোগ দিলেও তেমন কোনও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তথ্য মন্ত্রণালয়, বিটিআরসি, এনবিআর ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো এই সমস্যার সমাধানে যথাযথ মনোযোগ দেয়নি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতার বড় চ্যালেঞ্জ:
মিডিয়া প্রতিষ্ঠানের মালিকানা নিয়ে এই ধরনের অবৈধ দখল, জালিয়াতি এবং রাজনৈতিক প্রভাব গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও স্বচ্ছতার জন্য বড় হুমকি। মালিকানার স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে গণমাধ্যমের নৈতিকতা ও গুণগত মানও প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

মাইটিভির মালিকানা ও পরিচালনায় চলমান দ্বন্দ্ব কেবল একটি কোম্পানির সমস্যা নয়, এটি বাংলাদেশের গণমাধ্যম খাতের স্বচ্ছতা, নৈতিকতা ও স্বাধীনতার প্রশ্ন। সঠিক পদক্ষেপ না নিলে দেশের গণমাধ্যমের ওপর ভরসা ক্ষুণ্ন হতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন :

মাইটিভি তুমি কার?

প্রকাশিত: ১২:২০:১৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ জুন ২০২৫

বাংলাদেশের বেসরকারি স্যাটেলাইট টেলিভিশন খাতের একটি আলোচিত নাম ‘মাইটিভি’। তবে চ্যানেলটির পেছনে লুকানো আছে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে চলা মালিকানা বিরোধ, অবৈধ দখল, জালিয়াতি ও রাজনৈতিক প্রভাবের গল্প। সরকারি নথিপত্রে মালিক হিসেবে থাকা বিলকিস জাহানকে এ চ্যানেল থেকে সরিয়ে নাসিরুদ্দিন সাথী দীর্ঘদিন ধরে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করছেন। এই দ্বৈত মালিকানা পরিস্থিতি নিয়ে গণমাধ্যম, কর্মী ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে উদ্বেগ ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

প্রতিষ্ঠার ইতিহাস: বিলকিস জাহানের হাত ধরেই যাত্রা:
২০০৬ সালে ঢাকার মৌচাক এলাকা থেকে ‘মাইটিভি’ টেলিভিশন কার্যক্রম শুরু করেন বিলকিস জাহান। তিনি ‘ভিউ মিডিয়া’ নামের ভিডিও প্রোডাকশন প্রতিষ্ঠান চালাতেন, যার মাধ্যমে বিয়ের অনুষ্ঠানসহ বিভিন্ন ভিডিও তৈরি হতো। পরবর্তীতে ‘ভিএম ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড’ নামে একটি কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে পরিচালক হিসেবে ছিলেন বিলকিস জাহান ও তার পরিবারের সদস্যরা।

সরকারি রেকর্ডে এই প্রতিষ্ঠান মালিকানার বৈধ অধিকারভুক্ত। মাইটিভির টিন সার্টিফিকেট, কপিরাইট, ইনকর্পোরেশন সার্টিফিকেট এবং টেলিভিশনের তরঙ্গ বরাদ্দের অনুমতিসহ যাবতীয় কাগজপত্রে বিলকিস জাহানের নাম অন্তর্ভুক্ত।

মালিকানা দখলের অভিযোগ: নাসিরুদ্দিন সাথীর ভূমিকা:
তবে বাস্তবে চ্যানেলটির নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা দীর্ঘদিন ধরে করছেন নাসিরুদ্দিন সাথী। তিনি সৌদি আরবে ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে কাজ করতেন এবং দেশে ফিরে ‘ভিউ মিডিয়া’ প্রতিষ্ঠা করেন। বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গেছে, সাথী পেশিশক্তি, জালিয়াতি এবং রাজনৈতিক প্রভাবের মাধ্যমে বিলকিস জাহানের কাছ থেকে মাইটিভির কার্যক্রম জোরপূর্বক দখল করে নিয়েছেন। যদিও মালিকানা স্থানান্তর হয়নি, তবু তিনি সত্ত্বাধিকারী হিসেবে চ্যানেলের দৈনন্দিন কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছেন।

বৈধতা ও আইনি জটিলতা:
বিলকিস জাহান মালিকানা বদলের জন্য কোনও আইনি প্রক্রিয়া গ্রহণ না করায় সরকারি নথিতে তার নাম এখনও রয়েছে। ফলে মালিকানার বৈধতা নিয়ে আইনি জটিলতা তৈরি হয়েছে। তবে সরকারি নথি ও লাইসেন্সে বিলকিস জাহানের নাম থাকার পরও নাসিরুদ্দিন সাথীর দখল অবৈধ। এই অবস্থায় আইনি লড়াইও চলছে এবং আদালতে মালিকানা অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রয়াস অব্যাহত রয়েছে।

জালিয়াতি ও স্বাক্ষর কেলেঙ্কারি:
মাইটিভির আর্কাইভ হেড শেখ মুনমুন লুসি সরকারি নথিতে বিলকিস জাহানের পরিবর্তে স্বাক্ষর করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এই ভূয়া স্বাক্ষর দিয়ে সরকারি দপ্তরে কাগজপত্র পরিচালনা করা হয়, যা পরিচয় জালিয়াতি ও প্রতারণার এক বড় উদাহরণ। আইনজীবী ও মিডিয়া বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের জালিয়াতি মিডিয়ার স্বচ্ছতা ও আইন শৃঙ্খলা রক্ষায় গুরুতর হুমকি।

রাজনৈতিক প্রভাব ও লাইসেন্স প্রদান:
মাইটিভির প্রথম সম্প্রচার শুরু হয়েছিল বিএনপির শাসনামলে অনুমোদন ছাড়াই, যা পরে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বন্ধ করে দেয়। পরে আওয়ামীলীগ সরকারের আমলে সাংবাদিক নেতা আলতাফ মাহমুদ লাইসেন্স প্রাপ্তির জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে গিয়েছিলেন। তার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে রাজনৈতিক প্রভাব ও নৈতিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে।

কর্মচারীদের দুর্ভোগ: বেতন ও নিরাপত্তার অভাব:
মাইটিভির কর্মীরা অভিযোগ করেন, নিয়মিত বেতন পান না তারা। চাকরির নিরাপত্তাও নেই। দীর্ঘমেয়াদী এই আর্থিক অনিশ্চয়তা তাদের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলেছে। এ বিষয়ে চ্যানেল কর্তৃপক্ষ কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি।

সরকারি সংস্থার নিষ্ক্রিয়তা:
বিলকিস জাহান নানা দফায় সংশ্লিষ্ট দপ্তরে অভিযোগ দিলেও তেমন কোনও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তথ্য মন্ত্রণালয়, বিটিআরসি, এনবিআর ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো এই সমস্যার সমাধানে যথাযথ মনোযোগ দেয়নি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতার বড় চ্যালেঞ্জ:
মিডিয়া প্রতিষ্ঠানের মালিকানা নিয়ে এই ধরনের অবৈধ দখল, জালিয়াতি এবং রাজনৈতিক প্রভাব গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও স্বচ্ছতার জন্য বড় হুমকি। মালিকানার স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে গণমাধ্যমের নৈতিকতা ও গুণগত মানও প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

মাইটিভির মালিকানা ও পরিচালনায় চলমান দ্বন্দ্ব কেবল একটি কোম্পানির সমস্যা নয়, এটি বাংলাদেশের গণমাধ্যম খাতের স্বচ্ছতা, নৈতিকতা ও স্বাধীনতার প্রশ্ন। সঠিক পদক্ষেপ না নিলে দেশের গণমাধ্যমের ওপর ভরসা ক্ষুণ্ন হতে পারে।